প্রতিবন্ধী মেধাবী কলেজ ছাত্রী রিনাকে ঈদ সামগ্রী ও ল্যাপটপ উপহার দিলেন সাংসদ খোকা

494

মোঃ তুহিনঃ নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে উপজেলার বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের দামোদরদী গ্রামের রিনা আক্তার নামে এক অসহায় পিতৃহারা শারীরিক প্রতিবন্ধী ও মেধাবী কলেজ ছাত্রীর বাড়িতে ঈদ সামগ্রী ও ল্যাপটপ নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য লিয়াকত হোসেন খোকা। গতকাল রোববার বিকেলে তিনি হঠাৎ বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের আনন্দবাজার এলাকায় দামোদরদী গ্রামে রিনা আক্তারের বাড়িতে এসমস্ত সামগ্রী নিয়ে উপস্থিত হন। এসময় রিনা আক্তারের আত্মীয়স্বজন ও গ্রামবাসী অশ্রæসিক্ত নয়নে সাংসদ খোকাকে অভিনন্দন জানায়। এসময় উপস্থিত ছিলেন বৈদ্যোরবাজার ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মোহাম্মদ আলী, আইয়ুব আলী, জাতীয় পার্টির নেতা শেখ ফরিদ, মোঃ ইলিয়াছ প্রমুখ।

জানা গেছে, উপজেলার আনন্দবাজার এলাকার মৃত আব্দুস সোবহানের চার সন্তানের মধ্যে মেঝ সন্তান রিনা আক্তার। জন্মগত শারীরিক প্রতিবন্ধী রিনা আক্তার এ বছর সোনারগাঁ কাজী ফজলুল হক উইমেন্স কলেজ থেকে ব্যবসায় শিক্ষা শাখা থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে।

সম্প্রতি লিয়াকত হোসেন খোকা এই অসহায় মেধাবী শিক্ষার্থীর মায়ের কোলে চড়ে কলেজে আসা যাওয়া ও পরীক্ষায় অংশগ্রণের খবর জানতে পারেন। পরে গতকাল রোববার বিকেলে তিনি রিনা আক্তারের জন্য একটি এইচপি ব্যান্ডের ল্যাপটপ, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে নতুন জামা কাপড়, মায়ের জন্য শাড়ি, সেমাই, চিনি, তেল ও সোনারগাঁয়ের সুস্বাদু লিচুসহ বিভিন্ন ঈদ সামগ্রী নিয়ে তার বাড়িতে হাজির হন। হঠাৎ সংসদ সদস্যকে দেখে রিনা আক্তার, তার আত্মীয়স্বজন ও গ্রামবাসীর মাঝে উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়।

এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা বলেন, শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও রিনা যেভাবে কষ্ট করে লেখাপড়া করছে এতে আমি তাকে নিয়ে গর্ববোধ করি। রিনাকে কেউ যেন পিতৃহারা না বলে। আজ থেকে লিয়াকত হোসেন খোকা তার বাবা ও ডালিয়া তার মা। সে যতদূর লেখাপড়া করতে চায় আমি তাকে পড়াবো। তার সম্পূর্ণ দায়-দায়িত্ব আমার।

এমপি খোকা আরও বলেন, শুধু রিনা আক্তারই নয়। বরং সোনারগাঁয়ে যত প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী রয়েছে আমি তাদের পাশে আছি। আমরা সবাই এক সঙ্গে এবারের ঈদুল ফিতর উদযাপন করবো।

অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে প্রতিবন্ধী রিনা আক্তার জানায়, এমপি সাহেব এভাবে আমাদের বাড়িতে ল্যাপটপ ও ঈদ সামগ্রী নিয়ে আসবেন তা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি। আমার যে একটা ল্যাপটপের শখ ছিলো তা তিনি কিভাবে জেনেছেন তাও আমার জানা নেই। তিনি সোনারগাঁয়ের গর্ব। আমরা মন থেকে তার জন্য দোয়া করি।

বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের মেম্বার আইয়ুব আলী ও মোহাম্মদ আলী জানান, এমপি সাহেব এসেছেন শুনে আমরা এখানে ছুটে এসেছি। তিনি আজ মহানুভবতার যে দৃষ্টান্ত গড়লেন। প্রত্যেক জনপ্রতিনিধির উচিৎ তার থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা।

উল্লেখ্য, উপজেলার বৈদ্যোরবাজার ইউনিয়নের দামোদরদী গ্রামের মৃত আব্দুস সোবহানের জন্মগত প্রতিবন্ধী মেয়ে রিনা আক্তার। জন্মগতভাবেই রিনার একটি পা নেই এবং অপর পা’টি খুব ছোট ও বোধশক্তিহীন। তাই তার চলাচলের একমাত্র অবলম্বন মায়ের কোল। তার বাবা দুই বছর আগে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ছিলেন শরবত বিক্রেতা। হাটে বাজারে বেলের শরবত বিক্রি করেই চালাতে হতো স্ত্রীসহ তার চার সন্তানের বড় সংসার। রিনা সংসারের তৃতীয় সন্তান। বড় বোনের বিয়ে দিয়ে দেয় ছোট থাকতেই। মেঝ ভাই রিনার মাত্র দেড় বছরের বড়। মাধ্যমিক পাশ করলেও বাবা মারা যাওয়ায় সংসারের হাল ধরতে গিয়ে পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায় তার। জীবিকার তাগিদে শুরু করেন বাবার শরবত ব্যবসা। ছোট বোন পান্না বৈদ্যোরবাজার এন এ এম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির ছাত্রী।

রিনার জন্ম ২০০০ সালে, জন্মের পর থেকেই তার এ অবস্থা দেখে শুরু হয় বাবা মায়ের দুঃশ্চিন্তা। কিভাবে চলবে রিনার জীবনযাত্রা। একটি ভাল চাকরি করে নিজেকে পরিচালনা করবে রিনা। সেই স্বপ্ন বাসা বাঁধে রিনার দরিদ্র বাবা মায়ের বুকে। তাই তাকে ভর্তি করে দেয়া হয় ব্রাক পরিচালিত স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে। ওই বিদ্যালয় থেকে রিনা প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৪.৮৩ পেয়ে সফলতার সাথে পাশ করে। তার এই ফলাফলে উৎসাহিত হয়ে তার মা-বাবা তাকে স্থানীয় বৈদ্যেরবাজার এনএএম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করেন। সেখান থেকে রিনা ২০১৪ সালে জেএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে (জিপিএ-৪.৯০) পেয়ে সফলতার সাথে কৃতকার্য হয়। সর্বশেষ ২০১৭ সালে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে সে জিপিএ-৪.৫ পেয়ে সফলতার সহিত উত্তীর্ন হয়। পরে রিনা সোনারগাঁ উইমেন্স বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হওয়ার জন্য গেলে মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকার জন্য ভর্তি হতে পারেনি। পরে সমাজের মানুষের সহযোগিতায় সে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হয়। এ বছর রিনা এইচএসসি পরীক্ষার্থী।

রিনা জানায়, আমার বাবার মৃত্যুর পর আমার মা খুব কষ্ট করে আমার পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছে। আমি আমার সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো রেজাল্ট করার চেষ্টা করি। এইচএসসি পরীক্ষায়ও ভালো ফলাফল করে ভালো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে আমি পড়ালেখা চালিয়ে যেতে চাই। সমাজের বোঝা হয়ে থাকতে চাই না। উচ্চ শিক্ষা শেষে একজন সফল ব্যাংকার হওয়ার স্বপ্ন ব্যক্ত করে এই অদম্য যোদ্ধা রিনা।

অদম্য মেধাবী রিনার মা মরিয়ম বেগম জানান, আমরা গরিব মানুষ। আমার মেয়ে শত বাঁধাকে অতিক্রম করে পড়ালেখা করছে। আমার স্বামী মারা যাওয়ায় আমার সংসার চালানো যাচ্ছে না। এর মাঝে রিনা ও তার ছোট বোন পান্নার পড়ালেখার খরচ চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাই তিনি সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের একান্ত সহযোগীতা কামনা করেন।

স্থানীয় বৈদ্যোরবাজার ইউনিয়ন পরিষদের ৯নং ওয়ার্ড সদস্য মোঃ বাসেদ মিয়া বলেন, মেয়েটির বাবা নেই। সে খুব দরিদ্র পরিবারে থেকেও কষ্ট করে পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী সবসময় তাকে সাহায্য সহযোগিতা করি।

এবিষয়ে জানতে চাইলে সোনারগাঁ উইমেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ শাহানা সুলতানা জানান, রিনা খুব ভালো একটি মেয়ে। সে আমাদের কলেজে ব্যবসায়ী শিক্ষা বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। আমি যতদূর জানি ছোটবেলায় টাইফয়েড হয়ে ওর পা দু’টো স্বাভাবিক মানুষের পায়ের মতো বৃদ্ধি পায়নি এবং তার ছোট পা দু’টিতে বোধশক্তি নেই। রিনা তার মায়ের কোলে করে কলেজে আসে বলেও জানান তিনি।

এবিষয়ে জানতে চাইলে সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অঞ্জন কুমার সরকার বলেন, অধম্য মেধাবী রিনা আক্তার ও তার পরিবারকে সহায়তার জন্য উপজেলা প্রশাসন এগিয়ে আসবে। আমি ওই মেধাবীর খোঁজ-খবর নেব। তাকে যতদুর সহযোগিতা করা যায়, আমরা তা করার চেষ্টা করব।