পঞ্চায়েত সভাপতির ষড়যন্ত্রে বীর মুক্তিযোদ্ধার সম্পত্তি দখলের চেষ্টা

448

নিজস্ব প্রতিনিধি : নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানার সাবদী এলাকায় স্থানীয় পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতির ষড়যন্ত্রে বীর মুক্তিযোদ্ধার পৈত্রিক ওয়ারিশ সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি দখলের পায়তারা করছে একটি প্রতিবেশী কুচক্রি মহল। মুক্তিযোদ্ধা ও তার ভাইদের ভোগদখল করা জায়গায় জোড় পূর্বক ঘর নির্মাণ করে এবং বিভিন্ন ধরনের ভয়-ভীতি, মারধোর সহ নানাভাবে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে মুক্তিযােদ্ধা মো. সিদ্দিকুর রহমান ও তার পরিবারকে হয়রানি করে চলেছে ওই চক্রটি। শুধু তাই নয়, পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি ছবির আহমেদের ষড়যন্ত্রে এলাকার একটিমাত্র মসজিদে সেই পরিবারের কোনো পুরুষ সদস্যকে নামাজ পড়তে দেয়া হচ্ছেনা। বাধ্য হয়ে আদালতের দারস্থ হয়েছে পরিবারটি। এমনটাই অভিযোগ ভুক্তভোগি বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তার পরিবারের।

মামলার কাগজপত্র ও ভুক্তভোগিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মো. সিদ্দিকুর রহমানের(৬৮) পৈত্রিক ওয়ারিশ সূত্রে প্রাপ্ত সাবদী মৌজায় সিএস ও এসএ-২১৫, আরএস-৩২৪ দাগে ৬০ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ সম্পত্তি পৈত্রিক ওয়ারিশ সূত্রে প্রাপ্ত হয়ে দীর্ঘদিন যাবত ভোগ দখল করে আসছেন কলাগাছিয়া ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড এর ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. সিদ্দিকুর রহমান ও তার অন্যান্য ভাইয়েরা। যার মূল দলিল রয়েছে তাদের কাছে। তবে বেশ কিছুদিন যাবত একই এলাকার মৃত লাল মিয়ার ৩ ছেলে বাহাউদ্দিন(৩৭), জসিম উদ্দিন(৪৫), মো. মহিউদ্দিন(৪২), লোকমান মিয়ার ছেলে মো. দিদার(৪২) ও মো. রাকিব(২২) সহ ৩/৪জন স্থানীয় সন্ত্রাসী নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিকুর রহমানের স্বত্ত্ব দখলীয় সম্পত্তি দখল করার উদ্দেশ্যে চলতি বছরের ২৯ মে থেকে তাদের পরিবারের উপর হামলা চালায়। এসময় আসামীরা পরিবারটিকে কিল ঘুষি সহ মারধোর করে মারাত্মক জখম করে এবং সেইসাথে বাড়ির সব পুরুষদের জানে মেরে ফেলার হুমকি ধামকি দিতে শুরু করে। সম্পত্তিটি দখল করার উদ্দেশ্যে তারা সেখানে ইট, বালু, রড, সিমেন্ট সহ বিভিন্ন নির্মাণ সামগ্রী মজুদ করে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. সিদ্দিকুর রহমান জানান, ‘ওই ঘটনার পর আমি আদালতের দারস্থ হই। যা নারায়ণগঞ্জ জজ কোর্টের বিজ্ঞ সিনিয়র সহকারী জজ ২য় আদালত নারায়ণগঞ্জ দে: মো: ২৯/১৯ মূলে বিচারাধীন রয়েছে। কিন্তু আদালত থেকে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার দরখাস্ত পেয়ে আসামীরা আরো বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে।’

সিদ্দিকুর রহমানের অপর দুই ভাই আব্দুল খালেক(৭২) ও আমির হোসেন জানান, সম্পত্তি দখল করতে না পেরে এলাকার পঞ্চায়েত কমিটির বর্তমান সভাপতি ছবির আহমেদের ষড়যন্ত্রে এলাকার একটিমাত্র মসজিদে আমাদের পরিবারের পুরুষ সদস্যদেরকে নামাজের জন্য ঢুকতে দিচ্ছেনা বিবাদী পক্ষের লোকজন। মসজিদে গেলেই প্রত্যেককে হুমকি ধামকি দিয়ে বের করে দেয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, বাড়ি থেকে বের হয়ে উক্ত মসজিদের সামনে দিয়েই আমাদের মেইন রাস্তায় উঠতে হয় বিধায় তারা সব সময় সেখানে উৎপেতে থাকে এবং আমাদের পরিবারের ছোট-বড় প্রতিটি সদস্য সেখান দিয়ে যাবার সময় গালমন্দ সহ তেড়ে আসে মারতে। এভাবে আমরা প্রায় ঘরবন্দী হয়ে রয়েছি তাদের কারণে।

তাদের অভিযোগ, ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি ফায়দা লোটার জন্য জনসম্মুখে তাদেরকে উস্কে দিয়ে আমাদেরকে এভাবে নির্যাতন করে চলেছে। যতবারই আমরা তার কাছে বিচারের জন্য গেছি ততবারই সে ওই পক্ষের হয়ে কথা বলেছে।

সমস্ত কাগজপত্র ও সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, বাড়ির ৬০ শতাংশ সম্পত্তির মালিক ‍মৃত আসু প্রধান ও মৃত ইমান আলী প্রধান ছিলেন একই মায়ের পেটের ২ ভাই এবং ভায়রা। বাদি অর্থাৎ মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিকুর রহমান ও তার অন্যান্য ভাইয়েরা হচ্ছেন ছোট ভাই মৃত ইমান আলী প্রধানের বংশধর(নাতি) এবং বিবাদী পক্ষের সকলেই হচ্ছেন বড় ভাই মৃত আসু প্রধানের বংশধর(নাতি)। অর্থাৎ এই ৬০ শতাংশ সম্পত্তির মধ্যে ৩০ শতাংশ ইমান আলী ও বাকি ৩০ শতাংশ সম্পত্তির উত্তরাধিকার আসু প্রধানের বংশধর(নাতি) পাবেন। তবে জোড় খাটিয়ে সমস্ত সম্পত্তিটিই আসু প্রধানের বংশধরেরা দখলে নিতে চাইছে। যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলে আসছে উভয় পক্ষের।

এদিকে বাদী পক্ষের আইনজীবী বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ নারায়ণগঞ্জ জেলা কমান্ডের ডেপুটি কমান্ডার অ্যাডভোকেট নুরুল হুদা জানিয়েছেন, আমি তার পক্ষে সমস্ত কাগজপত্র দেখে সে লিগ্যালভাবে পাওনা বুঝেই আদালতে ২৯/১৯ ধারায় একটি মোকদ্দমা করেছি যা চলমান রয়েছে এবং আদালতের পক্ষ থেকে সম্পত্তিতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। কিন্তু বিবাদী পক্ষ খুবই দুষ্ট। তারা বিভিন্ন ধরনের হুমকি ধামকি ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মাধ্যমে জোড় পূর্বক জায়গাটিকে দখলে নিতে চাইছে। তবে আমরা চাই মুক্তিযোদ্ধারা সম্মানী ব্যক্তি, তাই তারা কোনোকিছু নিয়ে ঝগড়া করবেনা বরং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তারা নিজেদের অধিকার আদায় করবে। আদালতের রায়ই তারা মেনে নিবে।

তিনি আরো বলেন, উক্ত সম্পত্তির দলিল বাদীর নামে থাকলেও যে কোনো ভুলবশত সম্পত্তিটির রেকর্ড বিবাদী পক্ষের নামে হয়েছে। ফলে সেটির জোড়েই বিবাদী পক্ষ সম্পত্তিটি হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। তবে যেহেতু দলিল একটি সার্টিফাই ও সাবকাবলা দলিল এবং দীর্ঘদিনের পুরনো দলিল তাই এই দলিলটি বাদ না হলে কোনোদিনই অপর পক্ষ এই সম্পত্তি নিতে পারবেনা। দলিলসূত্রে এই সম্পত্তির মালিক মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিকুর রহমানই।

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কলাগাছিয়া ইউনিয়ন কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আলী আক্কাস মীর জানান, প্রায় ২ বছর যাবত এই সম্পত্তি নিয়ে সমস্যার কথা ‍শুনতে পাচ্ছি। আমরা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারকে বা আইন-আদালতকে বলতে পারিনা আপনারা অন্যের জায়গা জোড় পূর্বক দখল করে আমাদের দিন। আমাদের কথা হচ্ছে যার কাগজপত্র রয়েছে সে ই সম্পত্তি পাবে। এই বয়সে আমরা অসম্মানী হতে চাইনা। ঠিক তেমনি সিদ্দিকুর রহমানের সম্পত্তির মূল কাগজপত্র তার কাছে রয়েছে। সেটি বিচার বিশ্লেষন করে তার প্রাপ্য সম্পত্তি তাকে আদালত বুঝিয়ে দিবে আমরা তা চাই এবং আমরা মুক্তিযোদ্ধারা তার পাশে রয়েছি।

এদিকে সরেজমিনে গিয়ে এ ব্যাপারে বিবাদী পক্ষ ও অভিযুক্ত পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি ছবির আহমেদের সাথে কথা বলতে চাইলে তারা কথা বলতে রাজি হননি এবং সাংবাদিকদের সাথে দুর্ব্যহার করেন।

পরিবারটির দাবি, যেখানে ১ লক্ষ্য ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটারের দেশ রক্ষায় বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা জীবন হাতে নিয়ে ঝাপিয়ে পড়েছিল, সেখানে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের মাত্র ৩০ শতাংশ পৈত্রিক সম্পত্তি অন্যেরা হাতিয়ে নেয়ার দায় কে নেবে? তাদের অনুরোধ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিশেষ ছাড়ে নয়, বরং কোনো ধরনের অঘটন ঘটার আগেই মূল কাগজপত্র যাচাই বাছাইয়ের মধ্যদিয়ে আদালতের মাধ্যমে তাদের অধিকার বুঝিয়ে দেয়া হোক্।