প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী বাঁশ ও বেত শিল্পহারিয়ে যাচ্ছে

902

এস.এম রুবেল আকন্দ: এ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ছোট-বড় অনেক হস্তজাত বা কুটিরশিল্প। এমনি এক শিল্প দেশের জনজীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী বাঁশ ও বেত শিল্প। নানা সংকটে এ শিল্পের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারা ধীরে ধীরে চাপা পড়ছে আজ।

এক সময় গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম ভিত হিসেবে বাঁশ ও বেত শিল্পের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। ঘরবাড়ি নির্মাণ, মৎস্য শিকারের সরঞ্জাম, কৃষি যন্ত্রপাতি, গ্রহস্থালি আসবাবপত্র, জ্বালানি থেকে শুরু করে আরো অনেক ক্ষেত্রে বাঁশ-বেতের ব্যবহার ছিল অনিবার্য।

গ্রামীণ ও নগর জনপদে বাংলার ঘরে ঘরে বাঁশ ও বেতের তৈরি জিনিসের কদর ছিল চোখে পরার মতো। চেয়ার, টেবিল, বইয়ের সেল্ফ, মোড়া, কুলা, ঝুড়ি, ফুলদানি, ডোল, সাজি, ঢাকনা, খারাই, কলমদানি, হাতপাখা, চালনী, চাটাই, খেলনা থেকে শুরু করে ড্রইং রুমের আসবাবপত্র তৈরিতে বাঁশ ও বেত প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার করা হতো।

এমনকি, মাছ ধরার চাই, পলো, হাঁস-মুরগীর খাঁচা, শিশুদের ঘুম পাড়ানোর দোলনাও। এসব শৌখিন, রুচিশীল ও স্বাস্থ্যকর পণ্য দেশের বাইরেও স্থান করে নিয়েছিল। তবে, আগের মতো এখন আর হাট-বাজার ও বাড়িতে বাঁশ-বেতের কদর নেই। বর্তমান মিল-কলকারখানা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে আমাদের অনেক পুরনো ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে।

কাগজ তৈরির কাঁচামাল হিসেবে বাঁশের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। ঘরের আসবাবপত্র ও দৈনন্দিন জীবনেও বেতের চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশের যেখানে-সেখানে যে বাঁশ ও বেত জন্মাত এর কোনো পরিচর্যার প্রয়োজনও হতো না। আমাদের দেশে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ প্রজাতির বাঁশ জন্মে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- বাইজা বরাক, কাটা বরাক, শিলবরাক, মিতিঙ্গা, রফাই, ঢোল, কালী, মুলি, বারিয়াল, তুলা, ঝাওয়া বাঁশ ইত্যাদি। কিন্তু আমাদের এ মূলবান বনজ সম্পদ বাঁশ ও বেত প্রায় বিলুপ্ত হয়ে পড়ায় ঐতিহ্যবাহী এ কুটিরশিল্প এখন ধ্বংসের মুখে।

প্রযুক্তির যুগে আজ হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশ ও বেত শিল্প। গ্রামাঞ্চলের অনেক বাড়িতে চৈতালি ও গৃহস্থালির কাজে এ শিল্পের কোন কিছু এখন আর দেখা যায় না। এছাড়া, প্লাষ্টিক এবং অ্যালুমিনিয়াম সামগ্রীর অতি ব্যবহার, প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব, প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা, একমাত্র কাঁচামাল বাঁশ-বেতের প্রকট সংকটে ঐতিহ্যবাহী ও পরিবেশ বান্ধব এ কুটির শিল্পটি এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। ফলে এ শিল্পের সাথে জড়িতরা এক প্রকার বাধ্য হয়ে তাদের পৈতৃক পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় মনোনিবেশ করছে। এ শিল্প দেশ ও দেশের বাইরে নতুন দিক উন্মোচিত করতে সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ে বাঁশ ও বেত দেশীয় এ শিল্পকে বাঁচাতে উদ্যোগ নিয়ে আমাদের সবার এগিয়ে আসা উচিত।