চট্টগ্রামে মেগা প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে

291

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ করোনা সংক্রমণ কমানোর কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেও বন্দর নগরী চট্টগ্রামে সরকারের মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ এগিয়ে চলছে। মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে, চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গা ও আনোয়ারায় কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু টানেলসহ সড়ক নির্মাণ, পতেঙ্গা থেকে দক্ষিণ কাট্টলী রাসমনি ঘাট পর্যন্ত সাগর পাড়ের প্রায় ১৪ কিলোমিটার পর্যন্ত বেড়িবাঁধ কাম চার লেনের আউটার রিং রোড নির্মাণ, নগরীর কালুরঘাট সেতু থেকে চাক্তাইখাল পর্যন্ত কর্ণফুলীর তীরে সাড়ে ৮ কিলোমিটার সড়কসহ বেড়িবাঁধ নির্মাণ। মেগা প্রকল্পগুলোর বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের মধ্যেই প্রত্যাশিত গতিতে এগিয়ে চলছে দেশের একমাত্র নদীর তলদেশের নির্মাণাধীন টানেলের কাজ। লকডাউনের কারণে প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেই কর্ণফুলী নদীর তলদেশে ও দুই তীরে চলছে বিরামহীন কর্মযজ্ঞ। এরই মধ্যে কর্ণফুলী টানেলের সার্বিক কাজের অগ্রগতি হয়েছে সাড়ে ৬৭ শতাংশ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার স্বপ্ন দেখছে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। শুধু টিউব তৈরিতেই সীমাবদ্ধ নেই কাজ। নদীর দুই তীরে চলছে সংযোগ সড়ক, উড়াল সেতু নির্মাণসহ বিশাল কর্মযজ্ঞ। পালা করে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা কাজ করছেন দেশি-বিদেশি প্রকৌশলী আর শ্রমিক। শনিবার নগরীর কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মাণাধীন দেশের প্রথম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল প্রকল্প এলাকার পতেঙ্গা এবং আনোয়ারা প্রান্তে প্রকল্প এলাকা ঘুরে এই চিত্র দেখা গেছে। ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু টানেলের নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন। এখন পর্যন্ত এই প্রকল্পের ৬৭ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ ২০২২ সালের মধ্যে শেষ হবে বলে জানিয়েছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী হারুনুর রশিদ। তিনি জানান, দ্রুত চলছে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল তৈরির কাজ। দেশি-বিদেশি ১৩০০ শ্রমিকের অংশগ্রহণে চলছে বিরামহীন কর্মযজ্ঞ। কর্ণফুলী নদীর তলদেশ কিংবা দুই তীরে সমান রয়েছে কাজের গতি। প্রথম টিউবকে যান চলাচলের উপযোগী করার কাজ চলছে দ্রুততার সঙ্গে। এরই মধ্যে প্রথম টিউবে ৫২০ মিটার সড়ক তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয় টিউবের খননকাজও চলছে অভিন্ন গতিতে। মের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত দ্বিতীয় টিউব খনন হয়েছে ১২০০ মিটার। এখন যেভাবে কাজ চলছে- এভাবে কাজ করা গেলে ২০২২ সালের মধ্যেই টানেলের সব কাজ শেষ করতে পারবো আমরা। আশা করছি নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করে টানেল গাড়ি চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া সম্ভব হবে বলেন প্রকৌশলী হারুনুর রশিদ জানান।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম নগরীর কালুরঘাট সেতু থেকে চাক্তাইখাল পর্যন্ত কর্ণফুলীর তীরে সাড়ে ৮ কিলোমিটার সড়কসহ বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ চলছে বিরামহীন ভাবে। সড়ক নির্মাণের জন্য মাটি ভরাটের কাজও চলছে। কর্ণফুলীর চাক্তাইখাল থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত সড়ক সড়ক নির্মাণ জন্য মাটি ভরাট করা হয়েছে। এছাড়া ছয়টি খালের মুখে সøুইসগেট নির্মাণকাজ প্রায় শেষের দিকে। সেগুলো হলো- চাক্তাইখাল, রাজাখালী খাল, রাজাখালী শাখা খাল-১, রাজাখালী শাখা খাল-২, ডোম খাল ও বলিরহাট খাল। সড়কসহ বেড়িবাঁধ নির্মাণ করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে ঢাকা-কক্সবাজারমুখী যানবাহন নগরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করবে না। ফলে নগরের যানজট অর্ধেকে নেমে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্নিষ্টরা। এ ছাড়া ওই প্রকল্পের আওতায় ১২টি খালের মুখে বসানো হবে সুইসগেট। এতে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পাবে বাকলিয়া, কল্পলোক আবাসিক এলাকা, কালামিয়া বাজার, কালুরঘাট শিল্প এলাকা, বহদ্দারহাট ও চান্দগাঁও এলাকা।
প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা। ২০১৭ সালের ২৫ এপ্রিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়েছে ২০১৮ সালের ৬ নভেম্বর। ২০২০ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে এর সময় বাড়িয়ে ২০২১ সাল করা হয়েছে বলে জািনয়েছে, প্রকল্পটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্পেক্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড। বন্দর নগরীর আরেকটি মেগা প্রকল্প হচ্ছে, পতেঙ্গা থেকে দক্ষিণ কাট্টলী রাসমনি ঘাট পর্যন্ত সাগর পাড়ের প্রায় ১৪ কিলোমিটার পর্যন্ত বেড়িবাঁধ কাম চার লেনের আউটার রিং রোড়। ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ সাগর পাড়ের আউটার রিং রোডের প্রধান অংশের নির্মাণ কাজ প্রায় শেষ। কিন্তু নগরীর অভ্যন্তর থেকে এ রোডে যুক্ত হওয়ার তেমন কোনো সুযোগ নেই। এক প্রান্তে পতেঙ্গা এবং অপর প্রান্তে ফৌজদারহাট যুক্ত হওয়ার ভাল মাধ্যম, তবে হালিশহর আনন্দবাজার চৌচালার অপ্রচলিত রাস্তা দিয়ে অনেক যানবাহন চলাচল করলেও দুর্ভোগ অনেক। রিং রোডের কার্যকারিতা বাড়াতে এ প্রকল্পের সঙ্গে দুটো ফিডার রোডও অনুমোদন হয়েছিল। সেসব ফিডার রোড এখনো শেষ হয়নি। ফিডার রোডের অগ্রগতি দেখতে আউটার রিং রোডে গিয়ে দেখা যায়, দক্ষিণ কাট্টলী রাসমনি ঘাট প্রান্তে ফিডার রোড-৩ এর ৯০০ মিটার দীর্ঘ ফ্লাইওভারের কাজ চলছে। রিং রোড থেকে দেখা যায় ফ্লাইওভারের কাজ পুরোপুরি শেষ। কিন্তু হেঁটে সাগরিকার দিকে আসতে রেললাইনের (চট্টগ্রাম বন্দর ও ফৌজদারহাটের মধ্যে সংযোগকারী রেললাইন) উপরে দেখা যায় খালি। রেললাইনের উভয়দিকে ফ্লাইওভারের কাজ প্রায় শেষ থাকলেও মধ্যবর্তী অংশ খালি। এছাড়া স্টেডিয়ামের উপরের খালের অংশেও ফ্লাইওভারের কাজ কিছুটা বাকি রয়েছে। এ ফ্লাইওভারটি গিয়ে নামবে জহুর আহমদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের পাশে সাগরিকা রোডের সাথে। এতে অলংকার মোড় থেকে গাড়িগুলো সহজে এ ফিডার রোড দিয়ে আউটার রিং দিয়ে যাতায়াত করতে পারবে। রেললাইন জটিলতা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আউটার রিং রোড প্রকল্পের পরিচালক ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বলেন, ‘রেলওয়ে থেকে আমাদের প্রথমে বলা হয়েছিল ৭ দশমিক ৬ মিটার উঁচুতে গার্ডার বসাতে। কিন্তু এখন আবার বলা হলো ৮ মিটার উঁচুতে বসাতে। তাই নতুন করে আরো দুটি পিলার বসিয়ে উচ্চতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছি। এজন্য কাজ শেষ করতে দেরি হচ্ছে।’
ফিডার রোড তিন নম্বরে রেললাইনের উচ্চতা জটিলতা থাকলেও ফিডার রোড-১ আরো পিছিয়ে। পতেঙ্গা নারিকেল তলা দিয়ে খেজুরতলা পয়েন্টে এসে রিং রোডের সাথে যুক্ত হওয়ার কথা ফিডার রোড-১।

সরেজমিনে দেখা যায়, রিং রোডের নিচ দিয়ে একটি রোড এবং রিং রোডের পাশ দিয়ে একটি রোড নির্মাণের কাজ চলছে। এবিষয়ে প্রকল্পের পরিচালক কাজী হাসান বিন শামস বলেন, ‘জেলা প্রশাসন থেকে ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণের টাকা ক্ষতিগ্রস্তরা যথাসময়ে পায়নি বলে কাজে ধীরতা ছিল। তবে এখন দ্রুত কাজ করছি। নারিকেল তলা থেকে আসা ফৌজদারহাটমুখী গাড়িগুলো রিং রোডের নিচ দিয়ে এসে প্রধান সড়কের সাথে যুক্ত হবে। এছাড়া পতেঙ্গামুখী গাড়িগুলো বাম দিকের একটি লেন দিয়ে রিং রোডের সাথে যুক্ত হবে। ফিডার রোডের কাজ কবে নাগাদ শেষ হতে পারে জানতে চাইলে প্রকল্পের পরিচালক কাজী হাসান বিন শামস বলেন, ‘আশা করছি আগামী ছয় মাসের মধ্যে ফিডার রোড-১ ও ফিডা রোড-৩ এর কাজ শেষ করা যাবে। আর তা করা গেলে নগরীর অভ্যন্তর থেকে গাড়িগুলো সহজে আউটার রিংরোডে যাতায়াত করতে পারবে।