ঘূর্ণিঝড় রেমালে বিধ্বস্ত বাংলাদেশ

41


মোঃ মিঠু আহম্মেদ নারায়ণগঞ্জ-
দীর্ঘ ১৬ ঘণ্টা সময় নিয়ে স্থলভাগ অতিক্রম করেছে প্রবল ঘূর্ণিঝড় রেমাল। সেখানেই শেষ নয়, ঘূর্ণিঝড় দুর্বল হয়ে গভীর স্থল নিম্নচাপে পরিণত হওয়ার পর প্রায় ২৪ ঘণ্টাতেও সারা দেশে থামেনি বৃষ্টিপাত ও ঝড়ো হাওয়া। এ অবস্থায় গোটা দেশকেই রেমালের কারণে ভুগতে হলেও উপকূলে রেমাল যে দগদগে ক্ষত তৈরি করেছে, তার উপশম শিগগিরই মিলবে না বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা।

রোববার (২৬ মে) সন্ধ্যায় মোংলার কাছে পটুয়াখালীর খেপুপাড়া উপকূলে আঘাত হানে রেমাল। শেষ পর্যন্ত এটি দুর্বল হয়ে গভীর স্থল নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে সোমবার (২৭ মে) সকাল ১০টায়। পটুয়াখালী, সাতক্ষীরা, খুলনা হয়ে তখন এটি অবস্থান করছিল যশোরে। এরপর গত ২৪ ঘণ্টাতেও রেমালের নিম্নচাপের প্রভাবে ভারী বৃষ্টিপাত ও ঝড়ো হাওয়া থামেনি।
উপকূলীয় জেলাগুলোসহ সারা দেশেই ঝড়বৃষ্টিতে নাকাল হয়েছে মানুষ। আগে থেকেই জলোচ্ছ্বাস আর জোয়ারে প্লাবিত উপকূলে দিনভর ঝড়-বৃষ্টি আরও দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। খোদ রাজধানী ঢাকাও মুক্তি পায়নি রেমালের প্রভাব থেকে।

খুলনা জেলায় ৭৬ হাজার ৯০৪টি ঘরবাড়ি বিধ্বস্তের খবর দিয়েছে জেলা প্রশাসন। এ ছাড়া ঘূর্ণিঝড়ে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিভিন্ন ইউনিয়নের ৫২টি ওয়ার্ড। বিভিন্ন উপজেলার সঙ্গে খুলনা মহানগরীতেও অসংখ্য গাছপালা উপড়ে পড়েছে। ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় চার লাখ ৫২ হাজার ২০০ মানুষ। ভেঙে গেছে কাঁচা ঘরবাড়ি ও দোকানপাট।
জেলার দাকোপ, কয়রা ও পাইকগাছা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বেড়িবাধ ভেঙে গেছে। ভাঙা বাঁধ দিয়ে জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য গ্রাম। জলোচ্ছ্বাসে আক্রান্ত হয়েছে ১২ হাজার ৭১৫ হেক্টর জমির ফসল। ধান, পাট, সবজি ও তরমুজ আবাদ ছিল এসব জমিতে। রয়েছে ধানের বীজতলাও। পাশাপাশি ভেসে গেছে আট হাজার ৮৭৫টি পুকুর ও মাছের ঘের। এতে মৎস্যজীবীদের ক্ষতি অন্তত ১৬৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।

দুই দিনের টানা তাণ্ডবে ভোলায় প্রায় সাড়ে সাত হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে তিন শতাধিক গ্রাম। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাধের দুই হাজার ২০০ মিটার এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ে গাছ ও ঘরচাপায় প্রাণ হারিয়েছেন তিনজন। সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দুই লাখেরও বেশি মানুষ। দুই দিন ধরে পুরো জেলা বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বন্ধ রয়েছে মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবাও।
জেলার মনপুরা উপজেলায় চারটি স্থানে বেড়িবাধ ভেঙে ১০টির মতো গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। উপজেলার কলাতলি ইউনিয়নে অতি জোয়ারে চার-পাঁচ ফুট পনিতে প্লাবিত হয়েছে। চরফ্যাশনের বঙ্গোপসাগর মোহনার ঢালচর ইউনিয়নেও সবাই পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। একই অবস্থা সাগরমোহনার চর কুকরি-মুকরি ইউনিয়নে।

রেমালের প্রভাবে বাগেরহাট জেলার অন্তত ৪৫ হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। কয়েক হাজার গাছপালা উপড়ে পড়েছে। তিন থেকে পাঁচ ফুট পানি প্লাবিত হয়ে জেলার ৫০ হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়ায় বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে পুরো জেলা।
খুলনার মতো বাগেরহাটেও মাছের ঘের ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মোংলা, রামপাল, শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ ও সদর উপজেলায় প্রায় সাড়ে তিন হাজার চিংড়ি ঘের ও পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এক হাজার ৫৮১ হেক্টর ফসলি জমি। মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলায় প্রায় দুই কিলোমিটার বেড়িবাধ ভেঙে সাতটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। অপারেশনাল কার্যক্রমে ফিরেছে মোংলা সমুদ্রবন্দর। রেমালের সরাসরি আঘাতের শিকার হওয়ায় সুন্দরবনও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। সোমবার কটকা ও দুবলা এলাকা থেকে দুটি মৃত ও ৯টি আহত হরিণকে উদ্ধার করেন বনরক্ষীরা। রেমালের তাণ্ডবে বনে ২৫টি টহল ফাঁড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লবণাক্ত পানি ঢুকে নষ্ট হয়েছে কমপক্ষে ৮০টি মিষ্টি পানির পুকুর। খুলন অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) মিহির কুমার দো জানান, আরও বন্যপ্রাণী মারা গিয়ে থাকতে পারে।

রেমালের আঘাতে বরগুনা জেলায় অন্তত ১৬ হাজার ৪০৮টি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত তিন হাজার ৩৭৪টি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। জলোচ্ছ্বাসে আক্রান্ত হয়েছে প্রায় দুই লাখ ৩১ হাজার মানুষ। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, পায়রা ও বিষখালী নদীর উপকূলে অন্তত ৩০০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ছয় হাজার হেক্টর। ডুবে গেছে চার ১৫৭ হেক্টর মাছের ঘের। ১২ কিলোমিটার বাধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ডুবে গেছে দুটি ফেরিঘাট।

কক্সবাজার জেলায় ৯ নম্বর মহাবিপৎসংকেত নামিয়ে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হলেও ভারী বর্ষণ ও ঝড়ো হাওয়া থেমে নেই। ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড হয়েছে ৯৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত। উপকূলের অন্তত ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ভারী বর্ষণে জেলার পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধসের আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস।
কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের নাজিরাটেক, কুতুবদিয়া পাড়া, সমিতি পাড়া, মোস্তাকপাড়া, ফদনার ডেইল, নুনিয়ারছড়ার পাশাপাশি মহেশখালীর ধলাঘাটা ও মাতারবাড়ির অধিকাংশ এলাকা এবং সেন্টমার্টিন দ্বীপের কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ ও সেন্টমার্টিন দ্বীপের অন্তত ৫০০ বাড়িঘর উড়ে গেছে। অনেক গাছপালা ভেঙে গেছে। শাহপরীর দ্বীপের পশ্চিম বাধের দেড় কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর ও আশাশুনিতে জোয়ারের পানিতে বেড়িবাধ উপচে ও প্রবল বর্ষণে শত শত মাছের ঘের প্লাবিত হয়েছে। উপকূলীয় এলাকার অন্তত ৫৪১টি কাঁচা ঘরবাড়ি ধসে গেছে। উপকূলীয় এলাকা তো বটেই, সাতক্ষীরা জেলা শহরও বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

জেলার নিম্নাঞ্চল আগের দিনই প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি সোমবারের বর্ষণে চট্টগ্রাম মহানগরী জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। মূল সড়ক, অলিগলি কোমরপানিতে ডুবে যায়। বাসাবাড়িতেও পানি ঢুকে পড়ে। পানিবন্দি বাসায় আটকে পড়েন খোদ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী।
সোমবার ভোর থেকে চট্টগ্রাম নগরীসহ আশপাশের এলাকায় ব্যাপক বৃষ্টিপাত শুরু হয়। এদিন সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত ১৩২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। ভারী এই বর্ষণের পাশাপাশি জোয়ারের পানিতে নগরীর পাশাপাশি সীতাকুন্ড, রাউজান, লোহাগাড়া ও ফটিকছড়ি উপজেলার বেশকিছু এলাকাও তলিয়ে গেছে।
এদিকে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৯ নম্বর মহাবিপৎসংকেত তুলে নেওয়ার পর সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রম আংশিক চালু করা হয় সোমবার দুপুর ১২টার দিকে। সমুদ্র উত্তাল থাকায় তখনো জাহাজ ভিড়তে পারেনি। তবে জেটি ও ইয়ার্ডে কনটেইনার ও পণ্য পরিবহন সীমিত আকারে শুরু হয়। সোমবার সকালে চালু করে দেওয়া হয়েছে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম। ১৮ ঘণ্টা বন্ধ রাখার পর বঙ্গবন্ধু টানেলও খুলে দেওয়া হয়েছে।

তীব্র ঝড়ো হাওয়ায় ফেনী জেলার উপকূলীয় এলাকা সোনাগাজী, ফুলগাজী, পরশুরামসহ বিভিন্ন এলাকায় অনেক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। জেলার প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষ রোববার রাত থেকেই বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন রয়েছেন। এদিকে সোনাগাজী উপজেলার উপকূলীয় এলাকায় বন্যা প্রতিরক্ষা বেড়িবাধ না থাকায় তিন ইউনিয়নের চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দারা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন।

নোয়াখালীর হাতিয়ায় নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়নের ৯টি গ্রামসহ ১৪টি গ্রাম জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় ৪০ হাজার মানুষ। সোনাইমুড়ি বেগমগঞ্জ, সেনবাগে অতি বর্ষণ ও ঝড়ে গাছপালা ভেঙে গেছে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বৈদ্যুতিক খুঁটির। ৯টি উপজেলায় ২২৮টি খুঁটি ভেঙে গেছে, ৩২টি ট্রান্সফরমার নষ্ট হয়েছে। ৬ শতাধিক গাছ ভেঙে পড়ে বিদ্যুতের তার ছিড়ে গেছে।

রেমালের তাণ্ডব থেকে রেহাই পায়নি রাজধানী ঢাকাও। আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য বলছে, সোমবার ভোর থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ঢাকায় ১১৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। অতি ভারী এই বৃষ্টিপাতে স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়। দক্ষিণ সিটির বংশাল, সিদ্দিকবাজার, সিক্কাটুলি লেন, আগামাছি লেন, নাজিরাবাজার এবং উত্তর সিটির মিরপুর, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকায় সারা দিনই জলাবদ্ধতা ভোগান্তি তৈরি করে।
এ ছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে কমপক্ষে ৫০টি ও উত্তর সিটিতে শতাধিকসহ ঢাকায় দেড় শতাধিক গাছ উপড়ে পড়েছে বা ভেঙে পড়েছে। এসব গাছপালার কারণে যানবাহন চলাচলেও সাময়িক সমস্যা হয়। একই সঙ্গে দিনভর বিদ্যুৎও জ্বালিয়েছে রাজধানীবাসীকে। কোনো কোনো এলাকায় দীর্ঘ লোডশেডিং দেখা গেছে। আবার কোনো কোনো এলাকায় সকাল থেকেই বিদ্যুৎ নেই। বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৃষ্টি কমলে বিতরণ ব্যবস্থা ফের স্বাভাবিক হবে।
এদিকে ঘূর্ণিঝড় রেমালের তাণ্ডবে উপকূলীয় এলাকা বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার কথা স্বীকার করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। দফতরটি বলছে, পল্লী বিদ্যুতের ৬৫টি সমিতিতে গ্রাহক সংযোগ বন্ধ আছে। উপকূলীয় এলাকায় দুই কোটি ৭০ লাখ ৭৯ হাজার ৬৩১ গ্রাহক বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় আছেন। এ ছাড়া পোল, ট্রান্সফরমার, স্প্যানসহ বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম নষ্ট ও ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছে রেমালের প্রভাবে। এই ক্ষতির পরিমাণ ৮৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা বলে বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে।
অন্যদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতমন্ত্রী মহিববুর রহমান ব্রিফ করে বলেন, উপকূলের ১৯টি জেলা রেমালের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলার সংখ্যা ১০৭টি, ইউনিয়ন ও পৌরসভার সংখ্যা ৯১৪টি। এসব জেলা-উপজেলায় এক লাখ ৫০ হাজার ৪৭৫টি ঘরবাড়ি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর রেমালের প্রভাবে ছয় জেলায় প্রাণ হারিয়েছেন ১০ জন।