বাংলাদেশে অকারণ রবীন্দ্র-বিরোধিতা প্রসঙ্গে – রফিক সুলায়মানের কলাম

505

সময়ের চিন্তা ডট কমঃ কিছু কিছু নজরুলপ্রেমীর স্ট্যাটাস পড়ে বিস্মিত হই। আমি আরো বিস্মিত হই এই ভেবে যে তারা কেমন করে ২৫ খণ্ডের সুপরিসর রবীন্দ্র রচনাবলী আত্মস্থ করেছেন! তাদের প্রতি আমার হার্দিক শুভাশীষ জানিয়ে দুয়েকটি কথা শেয়ার করছি। একে ঐ সব নজরুলপ্রেমীর স্ট্যাটাস এবং মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া হিসেবেও দেখা যেতে পারে।]

পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্র-বিরোধী যে গোষ্ঠী রবীন্দ্রনাথের ব্রাহ্ম পরিচয় লুকিয়ে তাঁকে হিন্দু হিসেবে চিহ্নিত করে জন্ম-শতবার্ষিকীর অনুষ্ঠান বাধাগ্রস্ত করেছিলো; তাদের অন্যতম মোনায়েম খাঁ, খাজা শাহাবুদ্দিনসহ এদেশের কতিপয় কুলাঙ্গার বুদ্ধিজীবী।

পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খাঁ রবীন্দ্র জন্ম-শতবর্ষে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখে তিনি দেশের বরেণ্য দুই শিল্পী ও সঙ্গীতজ্ঞ শেখ লুৎফর রহমান এবং আবদুল লতিফকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনারা রবীন্দ্র-সঙ্গীত লিখতে পারেন না?’ কি তাজ্জব ব্যাপার! ১৯৬৭ সালের মাঝামাঝি জাতীয় পরিষদে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন ধৃষ্টতাপূর্ণ উক্তি করে বলেছিলেন, Rabindranath Tagore was never a part of our culture and literature.

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে রাজাকারদের মুখপত্র ‘দৈনিক সংবাদ’ রবীন্দ্র-বিরোধী প্রচার অব্যাহত রাখে। ৩০ এপ্রিল ১৯৭১: “যারা পূর্ব পাকিস্থানকে ‘বাংলাদেশ’ করেছিল, জিন্নাহ হলকে ‘সূর্য সেন’ করেছিল, রবীন্দ্রনাথকে জাতীয় কবি করেছিল আর সেই ঠাকুরেরই ‘ও আমার সোনার বাংলা’ জাতীয় সংগীত করেছিল তারা পাকিস্থানী হবার যোগ্যতা সর্বোতভাবে হারিয়েছে বলে কোন পাকিস্থানী আজ তার সমর্থন যোগাবে না।” এবং ১০ এপ্রিল ১৯৭১: “রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি হিন্দু।” ছি ছি ছি।

ব্রাহ্মরা একেশ্বরবাদী ছিলেন, তাঁরা নিরাকার ব্রহ্মার অর্চনা করতেন। তাদের পোশাক ছিলো পারসিক সুফিদের মতো। চিন্তায় ছিলেন অনেক উন্নত। উল্লেখ্য যে ব্রাহ্মরাই ভাই গিরিশ চন্দ্র সেনকে দিয়ে পবিত্র কোরান শরীফ অনুবাদ করিয়েছিলেন। রবি ঠাকুরের নিরাকার ঈশ্বরপ্রেম এবং ইশ্বরের প্রতি প্রবল ভালবাসার প্রবল অভিব্যক্তির সন্ধান না করে যারা তাঁর মাঝে ইসলাম-বিরোধী গন্ধের খোঁজ করেন তারা তাঁর বিশাল কর্মের ভাণ্ডার থেকে নিজেদের বঞ্চিত করেন। তাদের জন্যে সত্যি করুণা হয়। এই গানে কী একেশ্বরবাদিতা প্রকাশিত নয়? ‘ধায় যেন মোর সকল ভালোবাসা প্রভু, তোমার পানে, তোমার পানে, তোমার পানে। যায় যেন মোর সকল গভীর আশা প্রভু, তোমার কানে, তোমার কানে, তোমার কানে।’

এবার নজরুল-গবেষক মান্নান সৈয়দ কী লিখেছেন দেখুন। আমরা জানি যে শান্তি নিকেতনে কোন পূজো-অর্চনা হতো না। রবীন্দ্র পরিবারের সদস্যরা দুর্গা পূজোর সময় নানান অজুহাতে দূরে ছুটি কাটাতে যেতেন। মান্নান সৈয়দ জানাচ্ছেন যে, শান্তিনিকেতনে ঈদে মিলাদুন্নবী পালিত হতো। সেখানে কবিগুরুর বিখ্যাত গান ‘কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আসো / সাধক ওগো, প্রেমিক ওগো / পাগল ওগো, ধরায় আসো।’ ঈদে মিলাদুন্নবী মানে আমাদের রসুল [দ]-এর আবির্ভাব ও তিরোভাব দিবস। আমীন।

দুঃখ হয় আজো পাকি-প্রেতাত্মাদের অকারণ রবীন্দ্র-বিরোধিতা অব্যাহত।

সহায়িকাপঞ্জিঃ ১। রবীন্দ্র রচনাবলী ২। শান্তিনিকেতন – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ৩। জাতীয় দৈনিক ৪। রবীন্দ্রনাথ ও ইসলাম – অমিতাভ চৌধুরী ৫। সাহস – ওয়েব পোর্টাল।